অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলা নিয়ে এবার প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
নাবলুসের দক্ষিণে কুসরা এবং জালুদসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক এসব হামলায় বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। বাড়িঘর ও স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগও উঠেছে। কুসরায় একটি ফিলিস্তিনি বাড়িতে হামলার সময় সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে হামলার শিকার হয়েছে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের একটি অ্যাম্বুলেন্সও।
জালুদ গ্রামে হামলার শিকার হয়েছেন একটি ফিলিস্তিনি পরিবার এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির একটি সাংবাদিক দল। হামলায় এনবিসির এক সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন। একই সময়ে পশ্চিম তীরের আরও কয়েকটি এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলার খবর পাওয়া যায়।
এসব ঘটনার পর নেতানিয়াহু এক বিরল বিবৃতিতে কুসরা ও জালুদের হামলাকে ‘অপরাধমূলক সহিংসতা’ বলে নিন্দা জানান। তিনি হামলাকারীদের আইন ভঙ্গকারী ‘মুষ্টিমেয় দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
নেতানিয়াহুর দাবি, এসব হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে না, বরং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও ঘটনাগুলোকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছেন।
তবে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পরও মাঠপর্যায়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কুসরার হামলার ঘটনায় এখনো কোনো গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। যদিও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে আলাদা করেছে এবং হামলায় ব্যবহৃত সন্দেহভাজন কয়েকটি গাড়ি জব্দ করেছে।
এদিকে, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিশেষ করে আল-মুঘাইয়ের এলাকায় দীর্ঘদিনের অবরোধ ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং ভূমি দখলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
তবে ইসরায়েলি সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন কিছু উগ্র ব্যক্তির কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরছে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য নিন্দার পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব রয়েছে। তাদের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের কয়েকটি হামলাকে বিচ্ছিন্ন ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখিয়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বৃহত্তর বসতি সম্প্রসারণ নীতিকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি আশঙ্কা হলো, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আরও বাড়তে থাকলে পশ্চিম তীরে বড় ধরনের ফিলিস্তিনি প্রতিক্রিয়া বা নতুন সংঘাত তৈরি হতে পারে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্যও এমন পরিস্থিতি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কারণ পশ্চিম তীরে ইতোমধ্যেই কয়েক লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি সেখানে বসবাস করেন। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করে জাতিসংঘসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থা।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের এক হাজার ৩৩০টির বেশি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের হতাহত হওয়া কিংবা সম্পদের ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
ফলে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক নিন্দা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করবে এবং বাস্তবে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কতটা কমবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
একদিকে হামলা বন্ধে কঠোর বক্তব্য, অন্যদিকে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে চলমান বিতর্ক—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আরও জটিল হয়ে উঠছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের পরিস্থিতি।