রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবীর ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

আজ ১ সেপ্টেম্বর। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত একটি নাম—বঙ্গবীর জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন তিনি।

১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এম এ জি ওসমানী। অসাধারণ মেধাবী এই সামরিক কর্মকর্তা ১৯৩৪ সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা রণাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি কেন্দ্রীয় সামরিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল।

সেই দায়িত্বই কাঁধে তুলে নেন ওসমানী।

এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে তাকে মুক্তিবাহিনীর সর্বময় সামরিক নেতৃত্ব দেওয়া হয়। পরে মুজিবনগর সরকার তাকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়।

তার নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ, সেক্টরগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং গেরিলা অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

পাকিস্তানি বাহিনীর মতো সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শুধু সম্মুখযুদ্ধ যথেষ্ট নয়—এটি বুঝতে পেরেছিলেন ওসমানী। তাই গেরিলা যুদ্ধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত করে তাদের দুর্বল করে তোলার কৌশল নেওয়া হয়।

বিজয়ের শেষ প্রান্তে

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর যৌথ সামরিক অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

তবে ঐতিহাসিক সেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না।

ওসমানীর অনুপস্থিতি আজও ইতিহাসের একটি আলোচিত বিষয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের বর্ণনা অনুযায়ী, ওসমানীকে বহনকারী হেলিকপ্টার গুলিবর্ষণের মুখে পড়ায় তিনি সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। ওসমানীকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না দেওয়ার পেছনে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিশ্চিত বিষয় হলো, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকার।

ইতিহাসে ওসমানীর অবদান

ওসমানীর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল একটি সদ্যোজাত জাতির বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে সুসংগঠিত সামরিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে সামরিক দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়ে তিনি সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন।

১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই মহান সামরিক নেতা। পরে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে তাকে সমাহিত করা হয়।

একজন মেধাবী সামরিক কর্মকর্তা থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি—জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জীবন ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।

আজ তার ১০৮তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতি—মুক্তিযুদ্ধের সেই বঙ্গবীর সেনাপতিকে।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
01 September 2026

বঙ্গবীর ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

www.deshbanglabd.tv |
deshbanglatvnews
deshbanglatvnews